Share on social media

অন্তত ৩০টি রুট দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। এসব অস্ত্র পৌঁছে যাচ্ছে সন্ত্রাসী, জঙ্গি, ডাকাত থেকে শুরু করে কিছু রাজনৈতিক নেতার হাতে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া অন্তত ১৭ জন অস্ত্র কারবারিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পেয়েছেন পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর দারুসসালাম এলাকা থেকে আন্তর্দেশীয় অস্ত্র কারবারি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এই চক্রের অন্যতম সদস্য আকুল হোসেন যশোরের শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। সম্প্রতি রাজধানীর ভাসানটেকে এক ঠিকাদারকে গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধানে নেমে চক্রটির সন্ধান পায় ডিবির গুলশান বিভাগ। এই ঘটনায় দেশে অবৈধ অস্ত্রের কারবারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আকুল জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, সহযোগীদের নিয়ে তিনি গত ছয় বছরে দুই শতাধিক অস্ত্র বিক্রি করেছেন। এর সবই আনা হয়েছে সীমান্ত পথে ভারত থেকে।

একটি চক্রই যদি ছয় বছরে এত অস্ত্র বিক্রি করে থাকে, তাহলে কত মানুষের হাতে অবৈধ অস্ত্র আছে, তার সম্ভাব্য হিসাব চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কপালে। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টারের (বিডিপিসি) এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে অবৈধ অস্ত্র আমদানির শতাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের মালিকরা অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছেন একশ্রেণির সন্ত্রাসীদের কাছে। খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি টেন্ডারবাজিসহ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আধিপত্য বিস্তারের জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেও অনেক সময় দলীয় ক্যাডাররা অস্ত্রের মহড়া দেয়।

কখনো কখনো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা অস্ত্র জব্দও করেন। তবে তা খুবই সামান্য পরিমাণে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পর সারা দেশে অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অস্ত্র কারবারিরা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী এক শ্রেণির দরিদ্র লোকজনকে অবৈধ অস্ত্র বহন করতে ভাড়া করা হয়। অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তারা সীমান্ত পার করে নির্দিষ্ট স্থানে অস্ত্র পৌঁছে দেয়। এসব অস্ত্র তৈরিতে সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কারখানা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর নজরদারি পাশ কাটিয়ে চক্রের শতাধিক সদস্য সারা দেশে অস্ত্র কেনাবেচা করছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, অস্ত্র ও মাদকের বড় চালানগুলো দেশে ঢোকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে। এ ছাড়া যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, দর্শনা, শাহজাদপুর, হিজলা, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা, শিকারপুর, দৌলতপুর, দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। সীমান্ত এলাকার ঘাটমালিকরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ঘাট চালান।
সূত্র মতে, সাধারণ অস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রও দেশে ঢুকছে। বিষয়টি আলোচনায় আসে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর। ওই হামলার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আমের ঝুড়িতে করে আনা হয় একে-২২। যশোরের চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে আনা হয় বোমা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশে আসা বেশিরভাগ অস্ত্র তৈরি হয় পাশের দুই দেশে। বিশেষ করে ভারতের বিহারের রাজধানী পাটনা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের শহর মুঙ্গেরে তৈরি হয় এসব অস্ত্র। এর আগে পাচারের সময় প্রায় অর্ধশত একে-৪৭ জব্দ করে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। মুঙ্গেরের চুরওয়া, মস্তকপুর, বরহদ, নয়াগাঁও, তৌফির দিয়ারা, শাদিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক পাচারকারীদের কাছে বাংলাদেশ ট্রানজিট রুট হিসেবে ‘বেশ নির্ভরযোগ্য’ হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০০১ সালে জাতিসংষের একটি প্রতিবেদনে এর মূল কারণ চিহ্নিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। কারণ, মাদক উৎপাদনকারী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এবং ক্ষুদ্র অবৈধ অস্ত্র উৎপাদনকারী ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্টের’ মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের অবস্থান। একই মত লন্ডনভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক অন স্মল আর্মস’ এবং কলম্বোভিত্তিক ‘সাউথ এশিয়ান স্মল আর্মস নেটওয়ার্ক’-এর।

এদিকে আকুল ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২০১৯ সালে ধরা পড়ার পরও তিনি কীভাবে জামিনে বেরিয়ে এলেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সোনা ছিনতাই, মারামারিসহ কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওপর হামলাসংক্রান্ত আটটি মামলা রয়েছে। তার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক কারা, এখন পর্যন্ত তিনি কাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছেন, সীমান্তের দুই পাশে কঠোর পাহারা থাকার পরও কীভাবে এসব অস্ত্র দেশে এনেছিলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আকুলসহ আরও যারা অস্ত্র কারবারে জড়িত, তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। অস্ত্রের ক্রেতাদের একটি তালিকা আমরা পেয়েছি। তালিকা যাচাই-বাছাইসহ অস্ত্রগুলোর সন্ধান করা হচ্ছে।’

বেনাপোলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একাধিক সন্ত্রাসী, চোরাচালানি, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি, টেন্ডারবাজ, অস্ত্রবাজ, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, অপহরণকারীসহ বিভিন্ন কুচক্রী চক্রের সঙ্গে সখ্য রেখে দীর্ঘদিন অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য কেনাবেচা করছেন আকুল ও তার সহযোগীরা। স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডি পাচার, ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল কেনাবেচা ও ছিনতাইয়ের সঙ্গেও তাদের যোগসূত্র রয়েছে।

২০১৯ সালের ১৩ জুন বেনাপোল পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুলফিকার আলী মন্টুর ওপর বোমা হামলার ঘটনায় ১৪ জুন আকুলের বেনাপোলের ভাড়া বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ পিস্তলের তিন রাউন্ড গুলি, ১২টি ম্যাগাজিন, আটটি দেশীয় অস্ত্র ও ৩৩ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।

তবে আকুল গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার যশোর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তার স্ত্রী নাদিরা আক্তার লাইজু দাবি করেন, গ্রেপ্তারের ঘটনা সাজানো নাটক। সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে আকুলকে ফাঁসানো হয়েছে।

বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মামুন খান বলেন, আকুলের নামে বেনাপোল পোর্ট থানায় বিস্ফোরক, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা আছে।

সূত্র : কালের কণ্ঠ


Share on social media

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here